Tag: অনার্স থেকে বিসিএস প্রস্তুতি

  • অনার্স থেকে বিসিএস প্রস্তুতি – পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন 

    অনার্স থেকে বিসিএস প্রস্তুতি – পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন 

    বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার নাম হল বিসিএস। তাই অনার্স থেকে বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। সেই তুলনায় সুযোগ থাকে মাত্র কয়েক হাজার। এই কঠিন প্রতিযোগিতায় যারা সফল হন, তাদের বেশিরভাগের মধ্যে একটা মিল আছে- তারা তাড়াতাড়ি শুরু করেছিলেন। মাস্টার্স শেষ করে নয়, অনার্সে পড়তে পড়তেই তারা প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন।

    অনেকেই ভাবেন- “অনার্স শেষ হোক, তারপর দেখা যাবে।” কিন্তু এই একটা ভুল ধারণাই অনেকের বিসিএসের স্বপ্নকে কঠিন করে দেয়। আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে অনার্স থেকে বিসিএস প্রস্তুতি ঠিক কীভাবে নেওয়া যায়, কোন বর্ষে কী করবেন, কোন বইগুলো পড়বেন এবং কেমন রুটিন মানবেন সকল বিষয়গুলো সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন দেওয়া হবে। 

    অনার্স থেকে বিসিএস প্রস্তুতি 

    অনার্সে পড়ার সময়টা আসলে বিসিএস প্রস্তুতির জন্য সঠিক সময়। অনার্সে থাকা অবস্থায় আপনার হাতে সময় থাকে, মাথায় শেখার আগ্রহ থাকে এবং পড়াশোনার পরিবেশও অনুকূলে থাকে। শুধু তাই নয়, অনার্সের সিলেবাসের সাথে বিসিএসের সিলেবাসের অনেক জায়গায় মিল আছে। বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, ইংরেজি- এসব বিষয় অনার্সেও পড়তে হয়, বিসিএসেও লাগে। 

    অনার্সে পড়ার সময় থেকেই বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করতে হলে, প্রথমেই কিছু বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। যে ভিত্তিটা শুরুতেই মজবুত থাকে, পুরো প্রস্তুতিটা তার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। 

    বিসিএস কী এবং কত প্রকার তা জানুন  

    বিসিএস মূলত দুই ধরনের সাধারণ ক্যাডার ও কারিগরি/পেশাদার ক্যাডার। কোন ক্যাডারে আপনি যেতে চান সেটা আগে থেকেই ঠিক করে নিলে প্রস্তুতি নেওয়া অনেক সহজ হয়।

    বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস ভালোভাবে বুঝুন  

    সিলেবাল না জেনে পড়া শুরু করলে অনেক সময় নষ্ট হয়। পিএসসির অফিশিয়াল সিলেবাস একবার মনোযোগ দিয়ে পড়ুন এবং কোন বিষয়ে কতটুকু পড়তে হবে সেটা বুঝে নিন।

    মানবণ্টন বোঝা জরুরি

    প্রিলিমিনারিতে ২০০ নম্বর, লিখিততে ৯০০ নম্বর এবং ভাইভাতে ১০০ নম্বর- মোট ১২০০ নম্বরের এই পরীক্ষায় কোন ধাপে কোন বিষয়ে কত নম্বর সেটা জানলে কোথায় বেশি সময় দিতে হবে সেটা বুঝতে পারবেন।

    বিসিএস ক্যাডার লিস্ট দেখুন 

    বিসিএসে মোট ২৬টি ক্যাডার আছে। প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, শিক্ষা সহ বিভিন্ন ক্যাডারের কাজ ও সুযোগ-সুবিধা আলাদা। আগে থেকেই ক্যাডার পছন্দ ঠিক রাখলে লক্ষ্য নিয়ে এগোনো সহজ হয়।

    পরীক্ষার ধাপগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখুন 

    বিসিএস তিনটি ধাপে হয় প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা। প্রতিটি ধাপের ধরন, সময় এবং কৌশল আলাদা। তাই তিনটি ধাপ সম্পর্কেই শুরু থেকে একটা সাধারণ ধারণা রাখুন।

    বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ আপনি উপরের সকল বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক তথ্য পেতে আমাদের বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস ও মানবন্টন ব্লগটি দেখতে পারেন। 

    যদি প্রথমেই এই বিষয়গুলো পরিষ্কার থাকে আর অনার্সে ৪ বছরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তাহলে মাস্টার্স শেষ হওয়ার আগেই বিসিএস প্রিলিমিনারি পাস করার সুযোগ থাকে। আর যারা অনার্সের পরে শুরু করেন, তারা তখনও শুধু শুরু করছেন। এছাড়া ধীরে ধীরে পড়া সবসময় বেশি কার্যকর। একসাথে পুরো সিলেবাস পড়ে শেষ গেলে মাথায় থাকে না। কিন্তু ৩-৪ বছরে ধীরে ধীরে পড়লে সেটা দীর্ঘমেয়াদে মনে থাকে।

    কখন থেকে বিসিএস প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?

    সরাসরি উত্তর দিলে বলব অনার্স ১ম বর্ষ থেকেই। অনেকে মনে করেন, ১ম বর্ষে বিসিএসের কথা ভাবাটা অনেক আগে হয়ে যায়। কিন্তু এখানে একটু বুদ্ধি করে ভাবতে হবে। ১ম বর্ষে আপনাকে বিসিএসের পুরো সিলেবাস ধরতে হবে না। শুধু কিছু অভ্যাস গড়তে হবে যেগুলো পরে অনেক কাজে লাগবে।

    মনে রাখবেন- বিসিএস প্রস্তুতি মানে শুধু বই পড়া নয়। পত্রিকা পড়া, সাধারণ জ্ঞান আপডেট রাখা, ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়ানো- এগুলোও প্রস্তুতির অংশ।

    অনার্স ১ম বর্ষ থেকে বিসিএস প্রস্তুতি

    ১ম বর্ষে মূল লক্ষ্য হবে ভিত্তি তৈরি করা। এই সময়ে ভারী বই পড়ার দরকার নেই। বরং কিছু ভালো অভ্যাস তৈরি করুন যেগুলো পরের বছরগুলোতে কাজে লাগবে।

    ১ম বর্ষে যা করবেন:

    • প্রতিদিন একটি জাতীয় পত্রিকা পড়ুন-  অন্তত সম্পাদকীয় পাতা
    • বাংলা ব্যাকরণের মৌলিক বিষয়গুলো ঝালাই করুন
    • ইংরেজি গ্রামারের বেসিক- Tense, Parts of Speech, Sentence ভালো করুন
    • বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিন
    • বিসিএসের সিলেবাসটা একবার পড়ুন – শুধু একটা ধারণার জন্য

    ২য় বর্ষে যা করবেন:

    • বাংলা সাহিত্য- কবি-সাহিত্যিকদের পরিচয় ও রচনা শুরু করুন
    • সাধারণ বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো পড়ুন
    • গণিতের বেসিক- শতকরা, অনুপাত, সমীকরণ প্র্যাকটিস করুন
    • বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে একটা নোটবুক তৈরি করুন
    • প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৫০টা MCQ প্র্যাকটিস করুন

    অনার্স ৩য় বর্ষ থেকে বিসিএস প্রস্তুতি

    ৩য় বর্ষ হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পড়ার গতি বাড়াতে হবে এবং পুরো সিলেবাসটা বড় করে ধরতে হবে।

    ৩য় বর্ষে যা করবেন:

    • বিসিএস প্রিলিমিনারির পুরো সিলেবাস অনুযায়ী পড়া শুরু করুন
    • বিগত বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করুন
    • ইংরেজিতে Vocabulary, Idioms, Reading Comprehension গুরুত্ব দিন
    • মানসিক দক্ষতা ও IQ টাইপ প্রশ্নের প্র্যাকটিস করুন
    • প্রতিদিন ১০০+ MCQ প্র্যাকটিস করুন
    • মক টেস্টে অংশ নিন- দুর্বলতা খুঁজে বের করুন

    নিয়মিত MCQ প্র্যাকটিস করার জন্য সাজেশন হল Live MCQ অ্যাপ ব্যবহার করা। 

    ৪র্থ বর্ষে যা করবেন:

    • সিলেবাসের বাকি অংশ শেষ করুন এবং রিভিশন দিন
    • লিখিত পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুতি শুরু করুন
    • প্রতিদিন নিয়ম করে ফুল মক টেস্ট দিন
    • কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ুন
    • সম্ভব হলে বিসিএস প্রিলিমিনারিতে বসুন- অভিজ্ঞতা হবে

    শূন্য থেকে বিসিএস প্রস্তুতি 

    অনেকেই আছেন যারা অনার্সের ৩য় বা ৪র্থ বর্ষে এসে বুঝতে পারছেন এতদিন কিছুই করা হয়নি। তাদের জন্য বলছি হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শূন্য থেকে শুরু করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। শুধু দরকার একটু বেশি মনোযোগ এবং স্মার্ট প্ল্যানিং।

    শূন্য থেকে শুরুর কৌশল 

    প্রথম ১ মাস-  শুধু বিগত বছরের প্রশ্ন দেখুন এবং সিলেবাস বুঝুন। পরের ২-৩ মাস বিষয়ভিত্তিক পড়া শুরু করুন, দুর্বল জায়গাগুলো আগে ধরুন। এরপর- নিয়মিত মক টেস্ট এবং রিভিশন।মনে রাখবেন, একদিনে সব শেষ করতে হবে না। প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে গেলেই হবে।

    বিসিএস প্রস্তুতি রুটিন 

    বিএসস পরীক্ষার সিলেবাস যেহেতু অনেক বিশাল তাই রুটিন মানা আবশ্যক। রুটিন মানেই যে খুব কঠোর হতে হবে তা নয়। বরং এমন একটা রুটিন বানান যেটা আপনি সত্যিই মানতে পারবেন।

    নীচে একটি নমুনা রুটিন দেখানো হলো।

    দিনবিষয়সময়
    শনিবারবাংলা ভাষা ও সাহিত্য২ ঘণ্টা
    রবিবারইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য২ ঘণ্টা
    সোমবারবাংলাদেশ বিষয়াবলি২ ঘণ্টা
    মঙ্গলবারআন্তর্জাতিক বিষয়াবলি + কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স২ ঘণ্টা
    বুধবারগণিত ও মানসিক দক্ষতা২ ঘণ্টা
    বৃহস্পতিবারবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি + ভূগোল২ ঘণ্টা
    শুক্রবারফুল মক টেস্ট + রিভিশন৩ ঘণ্টা

    প্রতিদিন পড়ার শেষে ৫ মিনিট নোট করুন- আজকে কী পড়লেন, কোথায় আটকালেন। এটা রিভিশনের সময় অনেক কাজে লাগবে।

    বিসিএস প্রস্তুতি বই তালিকা

    বিসিএস প্রস্তুতির বই নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়েন। কোন বই কিনব, কতগুলো কিনব। সত্যি বলতে, অনেক বই কেনার দরকার নেই। বরং কম বই কিন্তু ভালো করে পড়ুন।

    বিসিএস পরীক্ষা ৩টি ধাপে বিভিক্ত থাকে। তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো- প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ভালো করার জন্য অবশ্যই ভালো মানের বই নির্ধারণ করতে হবে। তাই সাজেশন হল- Live MCQ (বিষয়ভিত্তিক) বিসিএস প্রিলিমিনারি জব সল্যুশন বইটি।

    এছাড়া বিসিএস এর প্রস্তুতিকে আরও গোছানো, শক্তিশালী করতে নীচের বইগুলো পড়তে হবে।  

    বাংলা: নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ (বোর্ড বই) পাশাপাশি হায়াৎ মামুদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, MP3 বাংলা গাইড। 
    ইংরেজি: Saifur’s Vocabulary, English for Competitive Exams, Professor’s BCS English Guide
    বাংলাদেশ বিষয়াবলি: বোর্ড বই পাশাপাশি আজকের বিশ্ব বাংলাদেশ গাইড, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস (মুনতাসীর মামুন), সংবিধান। 
    গণিত ও মানসিক দক্ষতা: বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান পাশাপাশি খাইরুলস ম্যাথ, Oracle Mental Ability
    সাধারণ বিজ্ঞান: নবম-দশম বিজ্ঞান বোর্ড বই পাশাপাশি আজকের বিশ্ব সাধারণ বিজ্ঞান, Live MCQ Science Expert
    আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স (মাসিক), তাজুল ইসলামের আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি। 

    বই কেনার চেয়ে বই পড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটা বই শেষ করুন, তারপর পরেরটা শুরু করুন।

    বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর 

    অনার্স করে কি বিসিএস দেওয়া যায়?

    হ্যাঁ, অবশ্যই যায়। বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকলেই হয়। তাই অনার্স ডিগ্রি নিয়ে বিসিএস দেওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব। তবে মনে রাখবেন, অনার্স শেষ হওয়ার আগেই প্রস্তুতি শুরু করলে আপনি বাকিদের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকবেন।

    বিসিএসের প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হয়?

    বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হল ধাপে ধাপে এগোনো। প্রথমে পিএসসির অফিশিয়াল সিলেবাস ও মানবণ্টন ভালোভাবে বুঝুন। এরপর বিষয়ভিত্তিক ভালো বই বেছে নিন এবং একটা নিয়মিত রুটিন তৈরি করুন। প্রতিদিন পত্রিকা পড়ুন, নিয়মিত MCQ প্র্যাকটিস করুন এবং বিগত বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল- ধারাবাহিকভাবে পড়ে যাওয়া।

    উপসংহার

    বিসিএস কঠিন, এটা সত্যি। কিন্তু অসম্ভব নয়। যারা ধৈর্য ধরে, পরিকল্পনা করে এগিয়ে যান- তারাই শেষে সফল হন।

    অনার্স থেকেই শুরু করলে আপনার হাতে সময় থাকে, ভুল শোধরানোর সুযোগ থাকে এবং আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয় ধীরে ধীরে। তাই আর দেরি না করে আজই একটা ছোট পদক্ষেপ নিন।

    নিয়মিত পত্রিকা পড়ুন, একটা বই ধরুন, কিংবা আজকের একটা MCQ সেট সলভ করুন। শুরুটা ছোট হলেও চলবে- কিন্তু শুরু করতে হবে। আজকের একটু পরিশ্রমই আগামীকালের বড় সাফল্যের ভিত্তি।